সর্বশেষ দুই দশকে যুক্তরাষ্ট্রের রেস্তোরাঁ পরিষেবায় বিশেষ স্থান দখল করে নিয়েছে ভারতীয় খাবার। একসময়কার সস্তা কারি হাউজ বা কারি ঘর ও বুফে রেস্তোরাঁ এখন উঁচুমানের ও বিলাসবহুল ডাইনিং অভিজ্ঞতা দিচ্ছে ভোক্তাদের। এ পরিবর্তনের নেপথ্যে রয়েছেন শেফ বিকাশ খান্নার মতো ব্যক্তিরা, যিনি মার্কিন মুলুকে ভারতীয় খাবার পরিবেশনার বিবর্তনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। খবর সিএনবিসি।
বিকাশ খান্না এক দশকের বেশি আগে নিউইয়র্ক সিটিতে ভারতীয় রেস্তোরাঁ ‘জুনুন’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় খাবারের একটি উন্নত সংস্করণ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা। এ প্রচেষ্টার ফলস্বরূপ জুনুন অর্জন করে মিশেলিন স্টার। ভারতীয় রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে প্রথম স্বীকৃতি পাওয়ার ঘটনা ছিল এটি।
তবে বিকাশ খান্না কর্মজীবনের শুরুর দিকে এতটা স্বাধীনতা পাননি। তিনি জানান, ৯/১১ পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রে তৎকালীন রেস্তোরাঁ মালিকরা ভারতীয় খাবারের বৈচিত্র্য নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। তাই মার্কিনদের পছন্দের সেই চিরাচরিত বাটার চিকেন ও টিক্কা মাসালার মতো খাবারেই সীমাবদ্ধ ছিলেন তিনি।
পরিবর্তন আসে যুক্তরাষ্ট্রের তারকা শেফ অ্যান্থনি বোর্দেইনের এক মন্তব্যে। বোর্দেইন প্রথমবার জুনুনে এসে বিকাশ খান্নাকে বলেন, ‘আমি বুঝতে পারি না কেন তোমাদের খাবারকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছে আকর্ষণীয় করার জন্য ভিন্নভাবে উপস্থাপন করতে চাও।’
আন্থনি বোর্দেইনের এ কথাকে গুরুত্বের সঙ্গে নেন বিকাশ খান্না। তিনি বুঝতে পারেন, নিজেদের ঐতিহ্যবাহী রন্ধনশিল্পের প্রতি আরো সম্মান দেখানো উচিত। এটিই তার পরবর্তী রেস্তোরাঁ বাংলোর ভিত্তি গড়ে দেয়।
নিউইয়র্কের অত্যন্ত জনপ্রিয় ভারতীয় রেস্তোরাঁগুলোর মধ্যে বাংলো এখন অন্যতম। এর সহপ্রতিষ্ঠাতা জিমি রিজভি জানান, বাংলোর জন্য অনলাইনে বুকিং শুরু হওয়ার ৩০ থেকে ৯০ সেকেন্ডের মধ্যেই সব আসন বুক হয়ে যায়। প্রতি রাতে এক হাজারের বেশি ভোজনরসিক অপেক্ষমাণ তালিকায় থাকেন।
বাজার গবেষণা সংস্থা ডেটাসেনশিয়ালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন ভারতীয় রেস্তোরাঁ খোলার সংখ্যা ১১৫-এ পৌঁছায়, যা ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে ছিল মাত্র ৫৪। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১৫৪টি হাই ভ্যালু ভারতীয় রেস্তোরাঁ আছে, যা ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ছিল মাত্র ১০১টি। এ সংখ্যা থেকেই বোঝা যায়, ভারতীয় খাবারের প্রতি আমেরিকানদের আগ্রহ কতটা বেড়েছে।
সারকোনার ফুডসার্ভিস বিশ্লেষক ডেভিড পোর্টাল্যাটিন জানান, মহামারী-পরবর্তী সময়ে মানুষ শুধু খাবার নয়, বরং একটি ভালো ডাইনিং অভিজ্ঞতা চাইছে। এ কারণেই ফাস্ট ফুড থেকে বেরিয়ে মানুষ এখন হাই ভ্যালু ডাইনিংয়ের দিকে ঝুঁকছে। তিনি আরো বলেন, ‘মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক চাপ থাকা সত্ত্বেও গত জুলাইয়ে উঁচুমানের রেস্টুরেন্টে গ্রাহকের আগমন ২০২৪ সালের একই সময়ের তুলনায় ৫ শতাংশ বেড়েছে।’
অন্যদিকে বিনিয়োগকারীরাও এ সুযোগে এগিয়ে আসছে। সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় ভারতীয় রেস্তোরাঁ চেইন ডিশুম আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যবসা প্রসারের জন্য একটি প্রাইভেট ইকুইটি ফার্মের সমর্থন পেয়েছে, যা রেস্তোরাঁটির ইতিহাসে প্রথম বাইরের বিনিয়োগ। এ চুক্তি অনুযায়ী, রেস্তোরাঁটির বাজারমূল্য এখন প্রায় মিলিয়ন ডলার।
ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশন অব আমেরিকা জানিয়েছে, ভারতীয় খাবারের ভবিষ্যৎ প্রবণতা হলো আঞ্চলিক খাবারের প্রসার। শেফরা ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের শত শত স্থানীয় খাবারকে মেনুতে অন্তর্ভুক্ত করছেন।
বিকাশ খান্নার রেস্তোরাঁয় আসা গ্রাহকদের মধ্যে একজন বলেছেন, ‘আমি জানি কেন সিয়াটলের প্রতিটি ভারতীয় সকাল ৮টায় ফোন করে একটি রিজার্ভেশন পেতে চায়। কারণ, তাদের কাছে এটি কেবল রেস্তোরাঁয় আসা নয়, এটি যেন বাড়িতে ফেরা।’ এ কথাই প্রমাণ করে, শুধু খাবারের জায়গা নয়, সাংস্কৃতিক সংযোগের কেন্দ্রও হয়ে ওঠেছে এসব ভারতীয় রেস্তোরাঁ।